অনাদি রঞ্জন বড়ুয়ার তিনটি কবিতা

কিছু কথা রয়ে গেছে বাকি

এখনো কিছু কথা আছে বাকি
রয়ে গেছে পথের আরো কিছু পথ,
আরো যে কিছু সময় রয়ে গেছে ; সময়ের  দূরন্ত কোলাহলে,
রয়ে গেছে উত্তাপ, বিকেলের শেষ রঙ,
গহীণ গাঙের পরে ; বাড়ী ফেরার মাতাল উৎসব।
জানি ফিরে আসবে
ফিরে আসার বারান্দায় দাঁড়াবে কোন এক উদ্ভ্রান্ত পথিক
দাঁড়াবো হয়তো আমি বা অন্য কোন কেউ
হয়তোবা তুমি- আমি কেউই নই
প্রকৃতির কোন নিজস্ব ভ্রূণ বেড়ে উঠার সুনসান নীরবতায়,
আমরাই হয়ে যাবো তাবৎ কালের শ্রেষ্ঠ রাজসাক্ষী ।
না জানি কেন যে এমন হয়
কেন যে বহে যায় বেলা,
কেন যে গুটিয়ে নেই আনন্দ সম্ভার
পরিপাটি পাটাতনে ছুঁড়ে দেই অগ্নিবাণ!
বয়ে যায় অস্থির এক মতিভ্রম
ঘুরেফিরে দেখি কোথাও কেউ নেই
একদন্ড সময় নেই, ভূখন্ড নেই
লাল- বেগুনী  গোলাপ হয়ে ওঠে এক একটি জগদ্দল পাথর।
এখনো কিছু কথা আছে বাকি,
চুপিচুপি বলি চুপকথন
ধরো আমার হাত,
ভেজাই দু’চোখ  একই সরোবরে,
আলোর পথে হয়ে যাই শান্ত, সৌম্য, সুখের আশ্বাস।


একটি গল্পের শুরু

এ শহরটির নাম মেঘশহর।
কোথাও গ্রাম নেই
পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে পাড়া, পাহাড় ডিঙ্গিয়ে আরো একটি পাড়া,
পথের নাম পাহাড়ের উঁচু ঢাল
অট্টালিকার নাম টংঘর
ভালোবাসার নাম সম্প্রীতি
নদীর নাম বসতি,
ঝর্ণাকে আমরা স্রষ্টা বলে জানি,
ভালোবাসি, প্রাণ ভরে ভালোবাসি ।
কতো মানুষ আসে,
আসে, বাসে আর ভেসে বেড়ায়
মুক্তবিহঙ্গে।
এখানে মেঘ নেমে আসে হাতে, মেঘখন্ড,
মেঘে ডুব দেয় মানুষ,
বিশ্বাস করো মানুষ ডুব দেয়;
মানুষ হয়ে যায় পাখাওয়ালা পরী ।
এখানে কথা কম
নীরবে-নির্বিঘ্নে চলে কিছু কানাঘুষো,
নিজের উদ্বেল বুক সঁপে দেয় নীলগিরি, নাফাকুম জল প্রপাত।
বড়পাথরে দেখা মেলে শান্ত, সৌম্য, ধ্যানস্থ  পৃথিবী,
মাতাল করে দেয় পাথরের জমাট ইতিবৃত্ত ।
তুমি আসবে কি!
যেখানে বনফুল মুঠিমুঠি, বিষাদে ফোটে লাল টকটকে সূর্য,
দেখা মেলে কলাপাতার বিনম্র সভ্যতা।
এখানে আকাশে ফোটে  শত সহস্র ফানুস,
বৈসাবি’র অনিন্দ্য উৎসব।
এখানে জলের রঙ নেই, আছে জলকেলি,
বাতাসে ভারী গন্ধ নেই, কানফাটা দূষণ নেই,
সবুজ দূর্বাঘাস।  
এখানে মাটির রঙে মানুষ,
এখানে মানুষগুলো মানুষের মতো,
পাখি ডাকে, ভোর হয়, সন্ধ্যা
নামে এক চিলতে উঠোনে ।
সময় চলে সময়ের মতো,
এটা শহর নয়,
খুঁটির উপর গড়া একটা স্বর্গভূমি।
সভ্যতার দর্পণে দেখো আদিবাস,
জুমিয়ার এক চিলতে সুখ।
কপালের ঠিক মাঝখানে রাখা বাদামী থুরুং
হাঁটে আর হাঁটে
সকাল-সন্ধ্যা, দিনের পুরোটা সময় ।
মাটির রঙের মানুষগুলো, মাটির রঙেই থাকে ।


তুমি শুনো বা নাই শুনো

যদি ফিরে যেতে চাও শূন্যে
মহাপ্রলয়েরও আগে
তার চেয়ে আরো বেগমান কোন উড়ন্ত সসারে
তবে ডেকে নিও আমায়।
স্মৃতিভষ্ম হাতে এই একমাত্র আমি
এখনো মৃদুমন্দ উত্তাপে
চেয়ে চেয়ে রই
মহাশূন্যের দিকে, বারে বারে ফেরাই এ দু’টো চোখ
ইশারায় বুঝে নিই,
বুঝে নিতে হয়
সীমানার অদুরে সীমাহীন মেঘরঙ
এখনো আলুথালু দাঁড়ায় আমার সম্মূখ বিভাজনে। 
তুমি কি রাঙাবে চোখ
মায়াবদ্ধ হাতে মুঠিমুঠি বিলাবে সুখের সংসার
কেন যে এতো আয়োজন!
কোন কিছুরইতো  শুরু নেই,  শেষ থাকেনা যেমন
জীবনের শেষ বেলা, কৈশোরের নাটাই হাতে,
সব হিসেব মিলে যায় মুহূর্তে
জীবন হারিয়ে যায় জীবনের আগেভাগেই
প্রাগৈতিহাসিক কোন বুড়ো বটবৃক্ষ যদি  মিটিমিটি হাসে
বলে দেয় নীরব কথাগুলো তুমি শুনো বা নাই শুনো, তার কি এসে যায়।

উত্তর দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here